পঞ্চগড়ে সেবা প্রদানে স্বেচ্ছাচারীতার অভিযোগ উঠেছে প্রাণীসম্পদ অফিসের এক ভেটেনারী সার্জনের বিরুদ্ধে। নিজের খেয়ালখুশি মতো করেন অফিস। কখনো উপস্থিতি খাতায় সই করেই অফিস সময়ে নিয়মিত সেবা প্রদান না করে চলে যান বাইরের কল ভিজিটে। সেখানে চড়া অর্থের বিনিময়ে দেন পশু চিকিৎসা। তার চাহিদা মতো টাকা দিতে না পারলে চিকিৎসা দিতে অস্বীকার করেন, ভিজিট কম দিলে মুখের ওপর ছুঁড়েও মারেন টাকা। আবার কখনো ভুল চিকিৎসায় পশু মারা গেলেও নিতে চাননা তার দ্বায়।
অদৃশ্য শক্তির বলে বলিয়ান এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অফিসে অভিযোগ করেও হয়না কোন লাভ। অর্থলোভী এ চিকিৎসক এতটাই বেপরোয়া যে, অভিযোগের বিষয়ে তার কাছে জানতে চাইলে, টাকার বিনিময়ে তো বটেই, এমনকি কম টাকায় চিকিৎসা দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব না বলে সাংবাদিকদের সামনে অকপটে স্বীকারও করেন তিনি। এমতাবস্থায় দুর্নীতিগ্রস্থ, অর্থলোভী এ কর্মকর্তার কাছে জিম্মিদশা থেকে মুক্তি চান অসহায় খামারীরা।
এদিকে সরকারী সেবা অর্থের বিনিময়ে দেবার সুযোগ নেই, কারো বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ পেলে নিয়মানুযায়ী ব্যাবস্থা গ্রহন করা হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রাণীসম্পদ বিভাগ প্রধান।
পেয়ারা বেগম, ভুক্তভোগী খামারী জানান
আমার গাভী বাছুর প্রসবের পর অসুস্থ হলে আমরা ভেটেনারী সার্জন আব্দুল আলীমকে ডাকি। তখন তাকে ৩ হাজার টাকা দিতে হয়। কিন্তু তার পরামর্শ মতে ৭টা ইনজেকশন পুশ করার পর গাভীটি আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ে। নিরুপায় হয়ে আব্দুল আলীমকে বারবার ফোন করা হলেও পরে আর তিনি ফোন রিসিভ করেননি, ফলে গাভীটি মারা যায়, এখন দুধের বাছুরটিকে বাঁচাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে আমাদের।
পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলা প্রাণী সম্পদ অফিসের ভেটেরিনারি সার্জন আব্দুল আলীমের ভুল চিকিৎসায় নিজের পোষা ফ্রিজিয়ান গাভীর মৃত্যুতে এভাবেই কান্নায় ভেঙে পড়েন মাড়েয়া কলোনিপাড়া গ্রামের খামারী পেয়ারা বেগম। ১২ বছর ধরে ফ্রিজিয়ান গাভীটিকে আদর যত্নে লালন করেছেন তিনি। গর্ভাবস্থায় একটি বাছুর প্রসব করার পর থেকে ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছিলোনা গাভীটি।
গত ০৮ সেপ্টেম্বর স্থানীয় পল্লী চিকিৎসকের পরামর্শে ফোন দিয়ে ভেটেনারী সার্জন আব্দুল আলীমকে ডাকা হলে দরকষাকষি করে চিকিৎসা দিতে তাদের কাছ থেকে ৩ হাজার টাকা ভিজিট নেন ভেটেনারী সার্জন আলীম। কিন্তু তার পরামর্শ মতো ৭টি ইনজেকশন করার পর গাভীর অবস্থার আরো অবনতি ঘটে। এমতাবস্থায় পুনরায় আব্দুল আলীমের স্মরনাপন্ন হলে তাতে কোন সাড়া দেননি তিনি। খিঁচুনি দিতে দিতে চোখের সামনেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে গাভীটি। এখন শখের গাভী হারিয়ে দুধের বাছুরটিকে নিয়ে বিপাকে পড়েছেন পেয়ারা বেগম ও তার স্বামী জালাল উদ্দীন। শুধু এটাই নয়, খামারীদের সাথে দরকষাকষি করে ভিজিটের টাকা নেওয়ার পরেও আলীমের ভুল চিকিৎসায় গাভী মারা যাওয়ার ঘটনা রয়েছে আরো অনেক।
খামারীদের আরো অভিযোগ, নিয়মিত অফিসে পাওয়া যায়না আব্দুল আলীমকে। ভাগ্যক্রমে পাওয়া গেলেও মোটা অংকের ভিজিট ছাড়া এক-পা নড়েননা তিনি। অনেক সময় মনমতো ভিজিট না দিতে পারলে সেটা মুখের ওপর ছুঁড়ে মারেন, এমন অভিযোগও করেন কেউ কেউ।
ভুক্তভোগী খামারীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে সেবা ভিজিট দর কষাকোষীর কথা স্বীকার করে সাংবাদিকদের কমনসেন্স নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সেই ভেটেনারী সার্জন।
সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমি ভেটেনারী সার্জন আমরা একটু বেশীই নিবো, আপনার একটা নিজের কমনসেন্স কি বলে- বলেন তো, আপনার কাছে ৪ হাজার টাকা চেয়েছি, আপনি ১৫’শ দিলে আমি নিবো! বলেন, এটলিস্ট ২৫’শ নিবো। কি? ঠিক কিনা বলেন,, আপনার কমনসেন্স কি বলে!
এদিকে এসব অনিয়মের বিষয় অবগত করে বক্তব্য চাইলে সদ্য বিদায়ী জেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ বাবুল হোসেন জানান, শুধু এসবই নয় আরো অনেক বড় বড় অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে উর্ধত্মন কর্তৃপক্ষের কারনে তার বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তবে, সদ্য যোগদান করায় এখনই এসব নিয়ে কথা বলতে চাননি বর্তমান জেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ নুরুল ইসলাম।
দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে খামারীদের চিকিৎসা সেবা প্রদানে সরকারের আন্তরিকতা সত্বেও একেকজন ভেটেনারী সার্জন আব্দুল আলীমের মতো অর্থলোভী, দুর্নীতিবাজ, দুপুরে খেতে গেলে আর আসেনা অফিসে, এমন কর্মকর্তাদের অনিয়মের কাছে জিম্মি হয়ে প্রতিনিয়ত ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে খামারীদের। দুর্নীতিবাজ এসব কর্মকর্তাদের বিষয়ে সঠিক তদন্ত করে, সঠিক বিচারের দাবী জানান সংশ্লিষ্টরা।