যখন সারাদেশের মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষার্থীরা তাদের বার্ষিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার ঢালুয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ইমরান হোসেন মিয়ার ভাগ্যে জুটেছে অন্য কিছু। আজ বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া বার্ষিক পরীক্ষায় তার বসার কথা থাকলেও, সে বর্তমানে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী। অভিযোগ উঠেছে, মাত্র ১৪ বছর বয়সী ইমরানকে ‘ছাত্রলীগ কর্মী’ সন্দেহে গ্রেপ্তার করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা একটি মামলায় জড়ানো হয়েছে।
ইমরানের বাবা, ক্ষুদ্র ডেকোরেটর ব্যবসায়ী ইসহাক মিয়া জানান, সোমবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে তার ছেলে ইমরানকে বাড়ি থেকে আটক করে নাঙ্গলকোট থানা পুলিশ। পরের দিন পুলিশ বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা দায়ের করে এবং তাতে ইমরানকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ইসহাক মিয়ার দাবি, তিনি বা তার ছেলে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত নন। তিনি ছেলের পরীক্ষার প্রবেশপত্র নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন, কিন্তু কোনো সহযোগিতা পাননি।
ইসহাক মিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আমার ছেলেটার জীবনটা শেষ করে দিল পুলিশ। আজ ওর ফাইনাল পরীক্ষা। কিন্তু নির্দোষ ছেলেটা এখন কারাগারে। এলাকার কেউ বলতে পারবে না আমার ছেলে বা আমি কোনো রাজনীতি করি। আমি ক্ষুদ্র ডেকোরেটর ব্যবসায়ী। আমার মনে হচ্ছে কেউ ষড়যন্ত্র করে পুলিশকে দিয়ে আমার ছেলেকে গ্রেপ্তার করিয়েছে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ইমরানের ছাত্রলীগের মিছিলে থাকার ন্যূনতম প্রমাণও নেই এবং তাকে সন্দেহের বশে ফাঁসানো হয়েছে। “ছেলের মুক্তির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। পরীক্ষার প্রবেশপত্র, পরীক্ষার ফি-এর কাগজপত্র নানাজনকে দেখিয়েছি। পুলিশকে বারবার বলেছি এসব অভিযোগ মিথ্যা, ছেলেটার পরীক্ষা দিতে তাকে ছাড়েন। কিন্তু তারা শোনেননি। নিজেদের কোটা পূরণ করতে ছেলেকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। আমি এই অন্যায়ের বিচার চাই,” যোগ করেন তিনি।
ঢালুয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বেলাল হোসেন মজুমদারও ইমরানের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কোনো তথ্য অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “ইমরান হোসেন আমাদের নিয়মিত শিক্ষার্থী। তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার কোনো তথ্য আমার কাছে নেই। কীভাবে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেটাও জানি না।”
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপপরিদর্শক আলমগীর বাদী হয়ে দায়ের করা মামলায় ২৫ জনের নাম-পরিচয়সহ অজ্ঞাতনামা ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এই মামলায় ইমরানকে ৬ নম্বর আসামি করা হয়েছে এবং এজাহারে তার পরিচয় ‘ছাত্রলীগ কর্মী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এজাহারে বলা হয়েছে, আসামিরা “নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের ৫০ থেকে ৬০ জন সক্রিয় সদস্য” হিসেবে সরকারবিরোধী স্লোগান দিয়ে ঝটিকা ও মশাল মিছিল করে।
তবে নাঙ্গলকোট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে ফজলুল হক দাবি করেছেন, তাদের কাছে ইমরানের কোনো ছবি বা ভিডিও না থাকলেও, অন্য গ্রেপ্তারকৃতদের তথ্যের ভিত্তিতে ইমরানের পরিচয় নিশ্চিত হয়েছেন। তিনি বলেন, “তারা নিশ্চিত করেছে, ইমরান নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী এবং ঝটিকা মিছিলে অংশ নিয়েছে। এ জন্য তাকে গ্রেপ্তার করে যথাযথ নিয়ম মেনে আদালতের মাধ্যমে জেলখানায় পাঠানো হয়েছে।”
এই ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে এবং একটি ১৪ বছর বয়সী স্কুলছাত্রের এভাবে রাজনৈতিক মামলায় জড়িয়ে পড়ার ঘটনা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ইমরানের পরিবার তার মুক্তির জন্য এবং এই অন্যায়ের বিচার চেয়ে সকলের সহযোগিতা কামনা করছে।