দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়ায় অবস্থিত ৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পুরোপুরি উৎপাদনে ফিরতে পারছে না। তিনটি ইউনিটের মধ্যে দুটি বিকল এবং একটি আংশিক চালু থাকায় উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে বিদ্যুৎ সংকট তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে আসন্ন বোরো মৌসুমে সেচ কার্যক্রম এবং স্থানীয় শিল্প-কারখানাগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইউনিটগুলোর বেহাল দশা:
দ্বিতীয় ইউনিট: ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রায় পাঁচ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে ১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার দ্বিতীয় ইউনিটটি। এটি মেরামতের জন্য প্রস্তুতকারী চীনা প্রতিষ্ঠান হারবিন ইন্টারন্যাশনাল ২৩ মিলিয়ন ডলার দাবি করেছে, যা কেন্দ্রটির প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের মোট খরচের (২২ মিলিয়ন ডলার) চেয়েও বেশি। এই বিপুল খরচের কারণে কর্তৃপক্ষ ইউনিটটি চালুর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।
তৃতীয় ইউনিট: কেন্দ্রের সবচেয়ে বড়, ২৭৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার তৃতীয় ইউনিটটি গত ১৬ অক্টোবর থেকে বন্ধ রয়েছে। গভর্ণর ভালভ স্টিম সেন্সরের টারবাইন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এর উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ১২ দিন পেরিয়ে গেলেও এটি কবে সচল হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। চীনা বিশেষজ্ঞরা ইউনিটটি ঠান্ডা হওয়ার পর মেরামতের কাজ শুরু করবেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
প্রথম ইউনিট: যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ১৯ অক্টোবর বন্ধ হয়ে যাওয়া ১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রথম ইউনিটটি সাত দিন পর, ২৬ অক্টোবর পুনরায় চালু হয়েছে। তবে, বর্তমানে এটি মাত্র ৫০ থেকে ৫২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, যা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে।
ইতিহাস ও বর্তমান পরিস্থিতি:
২০০৬ সালে ২৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতা নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে ২০১৭ সালে ২৭৫ মেগাওয়াটের আরও একটি ইউনিট যোগ হওয়ায় মোট উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়ায় ৫২৫ মেগাওয়াটে। তবে যান্ত্রিক ত্রুটিসহ নানা কারণে কেন্দ্রটি কখনোই তার পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারেনি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেও কেন্দ্রটির উৎপাদন পাঁচ দিনের জন্য পুরোপুরি বন্ধ ছিল। জুলাই এবং আগস্ট মাসেও একাধিকবার ইউনিটগুলো বিকল হয়ে পড়ে।
জনদুর্ভোগ ও অর্থনৈতিক ক্ষতি:
বিদ্যুৎকেন্দ্রের এই বেহাল দশার কারণে উত্তরাঞ্চলের আটটি জেলায় তীব্র লোডশেডিং ও লো-ভোল্টেজের সৃষ্টি হয়েছে। এতে জনদুর্ভোগ চরমে উঠেছে এবং শিল্প-কারখানা, বিশেষ করে চালকলগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। দিনাজপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক সহিদুর রহমান পাটোয়ারী মোহন বলেন, “এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি এই অঞ্চলের কৃষি ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য স্থাপন করা হয়েছিল। বিদ্যুতের সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে চালকল এবং আসন্ন বোরো চাষে মারাত্মক প্রভাব পড়বে।”
বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক জানিয়েছেন, তৃতীয় ইউনিটটি চালু করতে আরও সময় লাগবে, কারণ অনেক বিষয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে হবে। তবে সব ইউনিট কবে নাগাদ একযোগে উৎপাদনে ফিরবে, সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট ধারণা দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। ফলে, বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রকে ঘিরে অনিশ্চয়তা এবং উত্তরাঞ্চলের মানুষের ভোগান্তি দুটোই দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
আবু সায়েম/ডি.আর.বি