সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তাদের ঢাকায় রেখে পড়াশোনা করাচ্ছিলেন শিক্ষিকা মা ফাতেমা বেগম। তিনি থাকতেন চাঁদপুরের মতলবে। ছুটিছাটা ছাড়া মায়ের দেখাই পেত না ছেলেমেয়ে দুটি। সেই মা পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেডে আহত হয়ে মারা গেছেন। মাকে ছেড়ে দূরে থাকা ভাইবোন তাঁর এমন মর্মান্তিক মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না। তাদের বোবা কান্নায় স্তব্ধ স্বজনরাও।
ফাতেমা বেগম ছিলেন চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ঝিনাইয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা। দশম গ্রেডের দাবিতে ঢাকায় শিক্ষকদের আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। শাহবাগে পুলিশের ছোড়া সাউন্ড গ্রেনেডে আহত হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৬ নভেম্বর মারা যান তিনি।
গতকাল মঙ্গলবার মতলব উত্তর উপজেলার গনিয়ারপাড়ে গিয়ে কথা হয় ফাতেমা বেগমের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস ও ছেলে জুনায়েদ সিদ্দিকীর সঙ্গে। গনিয়ারপাড়ে তাদের নানার বাড়ি। শোকাহত ভাইবোন কোনো কথাই বলতে পারছিল না। আলাপচারিতার এক পর্যায়ে নবম শ্রেণিপড়ুয়া জুনায়েদ সিদ্দিকী বলল, দশম গ্রেড বুঝি না, আম্মুর অভাব বুঝি। আম্মু বলছিল তুমি সায়েন্টিস্ট হবা। আমার আম্মু তো আর কখনও আসবে না। জুনায়েদ ঢাকার মিরপুর-১০ নম্বর সেকশনের আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ছে।
তার বোন জান্নাতুল ফেরদৌস পড়ছেন ঢাকার উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দ্বাদশ শ্রেণিতে। তিনি বললেন, আদর করে আর কেউ বলবে না, মা তুমি ইঞ্জিনিয়ার হবা। বুয়েটের টিচার হবা। তোমার ভাই সায়েন্টিস্ট হবে। আম্মু পড়তে বস। কে বলবে– তোমাদের নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন! কথাগুলো বলতে বলতে ভাইকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন জান্নাতুল।
তাদের বাবা ডিএম সোলায়মান বলেন, সন্তানদের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা নেই তাঁর। তিনিও মিরপুরের একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক।
জান্নাতুল ফেরদাউস বুয়েট ক্যাম্পাসে তাঁর মামার বাসায় থেকে উদয়নে পড়তেন। জুনায়েদ সিদ্দিকী বাবার সঙ্গে থাকত মিরপুরে। ফাতেমা বেগম থাকতেন চাঁদপুরের মতলবে তাঁর কর্মস্থলে। মায়ের মৃত্যুর পর থেকে স্বজনদের বাড়িতে থাকছে ছেলেমেয়ে দুটি। সারাদিন মোবাইল ফোনে মায়ের ছবি দেখে আর কান্নাকাটি করে দিন কাটছে তাদের। স্বজনারও মর্মাহত। কী বলে সান্ত্বনা দেবেন সে ভাষাও জানা নেই কারও।
গত ৮ নভেম্বর দশম গ্রেডসহ তিন দফা দাবিতে শিক্ষকদের আন্দোলনে পুলিশের ছোড়া সাউন্ড গ্রেনেডে গুরুতর অসুস্থ হন ফাতেমা বেগম। পরে রাজধানীর মিরপুরের আলোক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৬ নভেম্বর সকাল ১০টায় মারা যান তিনি। সেদিন সন্ধ্যার পর তাঁর মরদেহ কর্মস্থল এলাকা ও গ্রামের বাড়ি ঠাকুরচরে নেওয়া হলে উপজেলার সহকর্মী শিক্ষকরা বাড়িতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন। উপজেলার ছেংগারচর পৌরসভার ঠাকুরচর গ্রামে বাড়ি ফাতেমা বেগমের।
ফাতেমা বেগম সম্পর্কে ঝিনাইয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল খায়ের বলেন, ‘আমাদের এই শিক্ষিকা অত্যন্ত মেধাবী ও দায়িত্বশীল ছিলেন। তিনি ইডেন মহিলা কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। এলাকার শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত দায়িত্বশীল, কোমলমনা ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষিকা।’