দুই বছরের দীর্ঘ অন্ধকার শেষে গাজার শিশুদের জীবনে ফিরে এসেছে নতুন ভোরের আভা। যুদ্ধ, অবরোধ ও ধ্বংসস্তূপের মাঝে অবশেষে খুলে গেছে স্কুলের দরজা। শনিবার থেকে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ (UNRWA) ঘোষণা করেছে, গাজার তিন লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী আবারও ক্লাসে ফিরেছে। এই খবর গাজাবাসীর কাছে যেন এক টুকরো আশার আলো—যেখানে মৃত্যু, ক্ষুধা আর ধ্বংসের ভেতরেও শিক্ষার প্রতি টান ফিকে হয়ে যায়নি।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের আক্রমণ শুরুর পর থেকে গাজায় শিক্ষা কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে স্থগিত হয়ে পড়েছিল। তার আগেও করোনাভাইরাস মহামারির কারণে টানা মাসের পর মাস বন্ধ ছিল স্কুলগুলো। ফলে প্রায় দুই বছর ধরে লাখো শিশু শিক্ষার বাইরে ছিল। এই সময় গাজায় ইসরায়েলি হামলায় শত শত স্কুল ধ্বংস হয়েছে, অনেকগুলো পরিণত হয়েছে শরণার্থী আশ্রয়কেন্দ্রে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে শিক্ষার পরিবেশ একেবারেই ভেঙে পড়েছিল। অবশেষে শনিবার থেকে ইউএনআরডব্লিউএ শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় শুরু করার উদ্যোগ নেয়—যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশুদের শিক্ষার অধিকার ফিরিয়ে দিতে।
ইউএনআরডব্লিউএ-এর মিডিয়া উপদেষ্টা আদনান আবু হাসনা জানান, সংস্থাটি তিন লাখ ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীর জন্য পুনরায় শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছে। তাঁর ভাষায়, “এই সংখ্যাটি আরও বাড়তে পারে।” তিনি জানান, প্রায় দশ হাজার শিক্ষার্থী সরাসরি স্কুল ও শেল্টারে উপস্থিত হয়ে ক্লাসে অংশ নেবে, বাকিরা অনলাইনে বা দূরশিক্ষণের মাধ্যমে পাঠ নেবে। এই প্রকল্পে আট হাজার শিক্ষক যুক্ত হয়েছেন, যারা যুদ্ধ-পরবর্তী এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠছেন।
যুদ্ধ শুরুর পর গাজার অনেক স্কুল ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফিলিস্তিনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ইসরায়েল ১৭২টি সরকারি স্কুল সম্পূর্ণ ধ্বংস, ১১৮টি স্কুল আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত, এবং ১০০টিরও বেশি ইউএনআরডব্লিউএ স্কুলে হামলা চালিয়েছে। এই আক্রমণে শিক্ষার্থীদের জীবনও রক্ষা পায়নি—১৭ হাজার ৭১১ শিক্ষার্থী নিহত, ২৫ হাজার ৮৯৭ জন আহত, এবং ৭৬৩ জন শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মী প্রাণ হারান। ফলে গাজার শিক্ষা কাঠামো একেবারেই ভেঙে পড়ে, যা এখন ধীরে ধীরে পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে।
যদিও ক্লাস শুরু হয়েছে, কিন্তু গাজায় এখনো ভয়াবহ মানবিক সংকট চলছে। আবু হাসনা জানিয়েছেন, ইউএনআরডব্লিউএ গাজার ২২টি কেন্দ্রীয় ক্লিনিক পুনরায় চালু করেছে এবং খাদ্য বিতরণের জন্য কয়েক ডজন পয়েন্টে কর্মী নিয়োজিত রেখেছে। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে—ইসরায়েলের অবরোধ। গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ, পোশাক, কম্বল, আশ্রয়ের উপকরণ—সবই সীমান্তে আটকে আছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, “ইসরায়েলি অবরোধের কারণে গাজায় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র প্রবাহিত হতে দেওয়া হচ্ছে না, এতে মানবিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে।
গাজার শহরগুলোতে ফিরে আসা লক্ষাধিক বাস্তুচ্যুত মানুষ এখনও খোলা আকাশের নিচে বাস করছে। যেসব পরিবার একসময় নিজেদের ঘরে নিরাপদে থাকত, তারা এখন ধ্বংসস্তূপে কিংবা ত্রাণকেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। খাবার, পানি, চিকিৎসা, এমনকি শিক্ষার মৌলিক অধিকারও এখন সংগ্রামের বিষয়। আবু হাসনা জানান, গাজার প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ এখন মানবিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল।
গত দুই বছরে ইসরায়েলি আগ্রাসনে গাজায় প্রায় ৬৮ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন—তাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, রাস্তাঘাট—কিছুই রক্ষা পায়নি। জাতিসংঘের হিসাবে, এই অঞ্চলের বেশিরভাগ অবকাঠামো এখন বসবাসের অনুপযোগী। শিক্ষার্থীরা স্কুলে ফিরলেও, তাদের শ্রেণিকক্ষের পাশে এখনও পড়ে আছে ধ্বংসস্তূপ আর ভাঙা বেঞ্চ।
সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও, গাজার এই শিশুদের স্কুলে ফেরা কেবল শিক্ষার পুনরারম্ভ নয়—এটি এক ধরনের প্রতীকী বিজয়। ধ্বংসের মুখেও তারা শেখার আলো জ্বালিয়ে রাখতে চায়। তাদের চোখে এখনো আছে ভবিষ্যতের স্বপ্ন, শিক্ষকরা সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের নীরব সৈনিক।
তথ্যসূত্র : সউদী গ্যাজেট, মিডলইস্টআই