ঢাকায় নৃশংসভাবে খুন হওয়া রংপুরের বদরগঞ্জের আশরাফুল হকের জানাজা ও দাফন ঘিরে পুরো নয়পাড়া গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
আজ শনিবার(১৫ নভেম্বর) ভোর থেকে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেন আশরাফুলের গ্রামের বাড়িতে। সকাল ৯ টার দিকে যখন জানাজা অনুষ্ঠিত হয়, তখন স্বজনদের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। আশরাফুলের মা, স্ত্রী, বাবা ও সন্তানসহ স্বজনদের আহাজারিতে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
শুক্রবার গভীর রাতে আশরাফুলের খণ্ডিত মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। পরদিন সকালে জানাজায় অংশ নিতে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসেন মুসল্লিরা। জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। এই হৃদয়বিদারক মুহূর্তে মায়ের আহাজারি, স্বজনদের কান্না এবং বিহ্বল মানুষের দীর্ঘশ্বাসে আশরাফুলের শেষবিদায় মুহূর্তটি আরও করুণ হয়ে ওঠে।
পরিবারের অভিযোগ, বাল্যবন্ধু জরেজ আশরাফুলকে ডেকে নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। নিহত আশরাফুলের বোন আনজিনা বেগম শুক্রবার সকালে ঢাকার শাহবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় আশরাফুলের বন্ধু জরেজুল ইসলাম জরেজকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এই ঘটনায় জরেজুল ইসলাম এবং শামীমা নামের এক নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আশরাফুল হকের স্ত্রী লাকী বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “জরেজকে নিজের ভাই মনে করত আমার স্বামী। জাপান যাওয়ার জন্য ১০ লাখ টাকা চেয়েছিল, আমরা সেই টাকাও দিতে চেয়েছিলাম। আরও টাকা লাগলে তাও দিতাম। আমার সব সম্পত্তি নিয়ে হলেও স্বামীকে বাঁচিয়ে রাখতাম। কেন আমার স্বামীর প্রাণ কেড়ে নিল? আমি জরেজের ফাঁসি চাই। যারা আমার স্বামীকে টুকরা টুকরা করেছে, সবার ফাঁসি চাই।”
বাবা আবদুর রশিদ বিলাপ করে বলেন, “আমি হাসপাতালে ছিলাম। জরেজ খুব তাগাদা দিয়ে ছেলেটাকে ঢাকা নিয়ে গেছে। বাবাটাকে খুন করবে জানলে নিজের জান দিয়ে হলেও ঢাকা যেতে দিতাম না। ছোট নাতি-নাতনি, আমাদের এখন কে দেখবে?”
মা এছরা খাতুন বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। স্বজনেরা জ্ঞান ফেরালে তিনি বিলাপ করে বলেন, “আমার ছেলে তো কারও ক্ষতি করেনি। তাহলে কেন এমন করল ওরা? কেন আমার ছেলেকে টুকরা টুকরা করল?”
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আশরাফুল হক মা-বাবার একমাত্র ছেলে ছিলেন। তাঁর চার বোন রয়েছে। আশরাফুল ছিলেন কাঁচামাল আমদানিকারক। বিভিন্ন দেশ থেকে কাঁচামাল এনে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন আড়তে সরবরাহ করতেন। তাঁর সংসারে ১৩ বছর বয়সী সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক মেয়ে এবং ৭ বছর বয়সী এক ছেলে রয়েছে।
এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য আমজাদ হোসেন জানান, আশরাফুল একজন বড় কাঁচামাল ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি নম্র ও ভদ্র মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। প্রতি বছর দুই ঈদে তিনি এলাকার গরিব মানুষদের শাড়ি, লুঙ্গি ও শুকনা খাবার বিতরণ করতেন। কোরবানি ঈদে গরু কিনে মাংসও বিতরণ করতেন। তিনি এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের কঠোর বিচার দাবি করেছেন।
বদরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম আতিকুর রহমান জানিয়েছেন, আশরাফুল হকের লাশ তাঁর নিজ গ্রামে দাফন করা হয়েছে। তাঁকে হত্যার ঘটনায় শাহবাগ থানায় মামলা হয়েছে এবং জরেজুল ও শামীমা নামের এক নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ১১ নভেম্বর মালয়েশিয়া-ফেরত বন্ধু জরেজুল ইসলামের সঙ্গে আশরাফুল ঢাকায় যান। এরপর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর হাইকোর্টসংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ মাঠের গেটের পাশে একটি ড্রাম থেকে তাঁর খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
এই নির্মম হত্যাকাণ্ড এলাকাবাসীর মধ্যে গভীর শোক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। সবাই আশরাফুলের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।