দেশজুড়ে চলমান তীব্র শৈত্যপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দুস্থ ও বয়োজ্যেষ্ঠরা। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে নৈশপ্রহরীর মতো কষ্টসাধ্য পেশায় নিয়োজিত ষাটোর্ধ্ব থেকে আশি বছর বয়সী বৃদ্ধদের দুর্ভোগ যেন আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। কনকনে ঠান্ডা, ঘন কুয়াশা আর রাতভর খোলা আকাশের নিচে টহল দেয়া সব মিলিয়ে এই শীত তাদের জন্য পরিণত হয়েছে নীরব মৃত্যুঝুঁকিতে।
রংপুরসহ বিভিন্ন শহরে ঘুরে দেখা যায়, সরকারি বিধি অনুযায়ী কর্মক্ষমতার সীমা অতিক্রম করলেও বাস্তবতার চাপে পড়ে বহু বৃদ্ধ এখনও রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন দোকান, মার্কেট, গ্যারেজ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। কারণ একটাই—বয়স্ক ভাতা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থ বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে তাদের ন্যূনতম জীবনধারণ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ।
এ বিষয়ে রংপুরের সিনিয়র সাংবাদিক দৈনিক প্রথম খবর এর
নির্বাহী সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম বাবলা প্রতিবেদককে বলেন,
এটা খুবই দুঃখজনক যে রাষ্ট্রের কাছে যাদের দেখভালের দায়িত্ব থাকার কথা, সেই বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষগুলোকে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে রাতভর পাহারা দিতে হচ্ছে পেটের দায়ে। শৈত্যপ্রবাহে এটি শুধু অমানবিক নয়, মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিও। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা ও তদারকির অভাবই এই অবস্থার মূল কারণ। বর্তমানে সরকার প্রদত্ত বয়স্ক ভাতা মাসিক যে পরিমাণ দেওয়া হয়, তা দিয়ে একজন মানুষের এক সপ্তাহের খাদ্যও জোগাড় করা কঠিন। চিকিৎসা, শীতবস্ত্র, বাসস্থান কিংবা অন্যান্য মৌলিক চাহিদার কথা সেখানে অবান্তর। ফলে শেষ বয়সে এসেও জীবনের তাগিদে তারা বাধ্য হচ্ছেন নৈশপ্রহরীর মতো ঝুঁকিপূর্ণ পেশা বেছে নিতে।
চলমান শৈত্যপ্রবাহ এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। রাতের তাপমাত্রা অনেক জেলায় ৮-১০ ডিগ্রির নিচে নেমে যাওয়ায় বৃদ্ধ নৈশপ্রহরীরা শ্বাসকষ্ট, বাতব্যথা, জ্বর ও নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেকের শরীরে নেই পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র, নেই নিয়মিত চিকিৎসার ব্যবস্থা। অথচ তাদের শ্রমের বিনিময়ে মাস শেষে মেলেনা পর্যাপ্ত বেতন। প্রতি মাসে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা পেয়ে চলে না তাদের সংসার।
নাগরিক সমাজের নেতা ও সমাজকর্মী এডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ বলেন,
“বৈষম্যটা এখানেই-যারা প্রকৃত অর্থে অসহায়, তারাই ভাতা পান না। আবার অনেকে রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব খাটিয়ে ভাতা পাচ্ছেন। সমাজসেবা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা না থাকলে এই বৈষম্য চলতেই থাকবে। বয়োজ্যেষ্ঠদের জন্য আলাদা শীতকালীন সহায়তা ও বিনামূল্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।
এদিকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে রয়েছে নানা বিতর্ক ও অভিযোগ, প্রকৃত দুস্থ ও কর্মক্ষমতাহীন অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ এখনও বয়স্ক ভাতার আওতার বাইরে রয়েগেছেন। আবার কোথাও কোথাও রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও তালিকাভুক্তিতে অনিয়মের কারণে তুলনামূলক সচ্ছল ব্যক্তিরাও ভাতা পাচ্ছেন। মাঠপর্যায়ে যথাযথ তদারকি ও স্বচ্ছতা না থাকায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উদ্দেশ্য অনেকাংশেই ব্যাহত হচ্ছে।
সার্বিক বিষয় নিয়ে দৈনিক দাবানলের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক খন্দকার মোস্তফা মোর্শেদ বলেন, “রাষ্ট্র যদি সত্যিই মানবিক হতে চায়, তাহলে বয়োজ্যেষ্ঠদের রাতজাগা পেশা থেকে সরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সমাজসেবা অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করে প্রকৃত দুস্থদের চিহ্নিত করা এখন সময়ের দাবি।
তিনি আরো বলেন, বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহলের মতে, সমাজসেবা অধিদপ্তরের কার্যক্রমে জবাবদিহিতা ও নজরদারি বাড়ানো জরুরি। শুধু ভাতা প্রদান করলেই দায়িত্ব শেষ নয়; উপকারভোগীর প্রকৃত অবস্থা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও জীবনমান নিয়মিত মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে যারা শারীরিকভাবে অক্ষম হয়েও বাধ্য হয়ে রাতের পাহারায় নিয়োজিত, তাদের পুনর্বাসন ও বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি।
এমন প্রেক্ষাপটে সচেতন মহল দাবি করছেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নতুন করে আশার আলো দেখাতে পারে বলে মনে করছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। নির্বাচনী ইশতেহারে দুস্থ বয়োজ্যেষ্ঠদের জীবনমান উন্নয়ন একটি অগ্রাধিকার ইস্যু হওয়া উচিত। বয়স্ক ভাতা বাস্তবসম্মতভাবে বৃদ্ধি, শীতপ্রবণ এলাকায় বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি, বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ, এবং কর্মক্ষমতাহীন বৃদ্ধদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলার অঙ্গীকার প্রয়োজন।
মানুষের জীবনের শেষ অধ্যায় যেন অবহেলা ও কষ্টে না কাটে—এটি কোনো দয়া নয়, রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। শৈত্যপ্রবাহে কাঁপতে থাকা বৃদ্ধ নৈশপ্রহরীদের অসহায় চেহারা আমাদের বিবেককে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, আসন্ন নির্বাচনে এই নীরব কষ্টের ভাষা কতটা গুরুত্ব পায়, আর সমাজসেবা ব্যবস্থায় কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।