অভিযোগের তীর ইটভাটা সমিতির প্রভাবশালী নেতাদের দিকে
রংপুর সিটি কর্পোরেশন এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে আইন অমান্য করে চলমান অন্তত ৯টি ইটভাটা নিয়ে তীব্র অভিযোগ উঠেছে। সরকারের স্পষ্ট প্রজ্ঞাপনে সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ইটভাটা স্থাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকলেও সংশ্লিষ্ট সমিতির প্রভাবশালী কয়েকজন নেতা দীর্ঘদিন ধরে এসব ভাটা চালিয়ে যাচ্ছে—এমনটাই অভিযোগ স্থানীয়দের।
অভিযোগ রয়েছে, ভাটাগুলো বৈধ–অবৈধ নির্বিশেষে ভাটা–প্রতি ৫০ হাজার টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়, যা থেকে পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, কৃষি বিভাগ, বিভিন্ন স্থানীয় ও রাজনৈতিক সংগঠনের কিছু ব্যক্তিকে ‘ম্যানেজ’ করা হয় বলে দাবি করেছেন একাধিক ভাটা–মালিক।
এই অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক, কোষাধ্যক্ষ আব্দুল্লাহ আল কাফী দুদু মিয়া এবং সাধারণ সম্পাদক এম আজিজুল ইসলাম।
এলাকাবাসীর অভিযোগের ভিত্তিতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বৈধতার আড়ালে হাইকোর্ট রিটের অজুহাত দেখিয়ে মহানগর এলাকার অন্তত ৯টি ইটভাটা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে নিয়ম-নীতির কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে। যে ইটভাটা গুলো রয়েছে মেসার্স এস টি আর ব্রিকস, স্বত্বাধিকারী: তরিকুল ইসলাম দিনার, আলম অ্যান্ড ব্রিকস ,স্বত্বাধিকারী: মোঃ আনারুল আলম,জনতা ব্রিকস, স্বত্বাধিকারী: শহিদুল ইসলাম ভাটা মালিক সমিতির নেতা।
রংপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী রংপুর জেলায় মোট ১৮১টি ইটভাটা থাকলেও লাইসেন্সপ্রাপ্ত মাত্র ৩৭টি, বাকি ইটভাটা সবই অনিয়মের ছত্রছায়ায় পরিচালিত হচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানাগেছে।
হারাগাছ এলাকার একজন ইটভাটা–মালিক আনারুল আলমের বক্তব্য হাই ভোল্টজে বুঝাযায়, জেলা প্রশাসন বা পরিবেশ অধিদপ্তর “তার কিছুই করতে পারবে না। এমন সামঞ্জস্যপূর্ণ বক্তব্য পাওয়া গেছে কোষাধ্যক্ষ আব্দুল্লাহ আল কাফী দুদু মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক এম আজিজুল ইসলামের কাছ থেকেও।
তবে তারা চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন“সমিতির উন্নয়নের জন্য বছরে মাত্র ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয়”।
এসব অবৈধ ভাটা থেকে নির্গত ধোঁয়া ও দূষণে রংপুর জেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমির উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে কৃষকদের কাছ থেকে। বিশেষজ্ঞরা জানান, কয়লা পোড়ানোর ধোঁয়ায় থাকা সালফার–নাইট্রোজেন যৌগ, ব্ল্যাক কার্বন ও ভারী ধাতু মাটির উর্বরতা নষ্ট করে,ফসলের বৃদ্ধি ব্যাহত করে,শ্বাসতন্ত্রের রোগ বাড়ায়,শিশু ও বয়স্কদের ফুসফুসঝুঁকি বাড়ায়,আশেপাশের গাছপালা শুকিয়ে ফেলে। এছাড়াও মাটির উপরিভাগ থেকে মাটি সংগ্রহ করায় এ অঞ্চলে কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে ফসল উৎপাদন বঞ্চিত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে ‘ঘুষ না দিলে অভিযান’, আর ‘ম্যানেজমেন্ট ঠিক থাকলে নিরবতা’—এমন দ্বৈত আচরণ বহু বছর ধরে চলছে। বিশেষত বদরগঞ্জ ও পীরগঞ্জ উপজেলায় অবৈধ ইটভাটার বিস্তার সবচেয়ে বেশি।
রংপুরে কর্মরত পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ–পরিচালক মোঃ আব্দুস সালাম সরকার বলেন, ইটভাটা নিষিদ্ধ এলাকায় ইটভাটা পরিচালনা আইনত দণ্ডনীয়। আমরা অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করি। যদি কেউ প্রভাব দেখিয়ে বা অবৈধভাবে ভাটা চালায়, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। পরিবেশ–ঝুঁকি সৃষ্টি করে এমন কোনো কার্যক্রম বরদাস্ত করা হবে না। আমরা ডিসি মহোদয় বরাবর অভিযান পরিচালনা করার জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট চেয়েছি।
তবে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া প্রসঙ্গে জানতে নবাগত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান এর সাথে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এদিকে সচেতন মহলের উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় অবৈধ ইটভাটার উপরে অভিযান পরিচালনার বিষয়টি শুধুমাত্র লোক দেখানো বলে মনে করেন তারা।