শিরোনাম
রংপুরে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনায় টিসিএ মিডিয়াকাপ-২০২৬ শুরু নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি | |Katha24.com || Katha Media বন্ধ কলকারখানা চালুর উদ্যোগ নিয়েছি: প্রধানমন্ত্রী রংপুরে নকলমুক্ত পরিবেশে এসএসসি ও সমমানের প্রথম পরীক্ষা অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদে আজ পাস হলো ২৪টি বিল, চলতি অধিবেশনে মোট ৯১টি বিল অনুমোদিত রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের নারী সাংবাদিকদের নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ের নির্বাচন রিপোর্টিং বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন … রংপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ডন রংপুরে জমি দখলকে কেন্দ্র করে হামলা, বৃদ্ধ ও কিশোরীসহ আহত অনেকে মিঠাপুকুরে বসতভিটায় হামলা: গাছ কেটে লাখ টাকার ক্ষতি, প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ রংপুরে ঈদুল ফিতরের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত
বুধবার, ০৬ মে ২০২৬, ০৯:২২ অপরাহ্ন

রংপুরের স্টেশনে কুলির কাঁধে গড়া মানবিকতা, নীরব শ্রমের গল্প

সানজানা ইবনাত / ৯১ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : বুধবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২৫

স্টেশন হলের উঁচু জানালাগুলো ভেদ করে আসা প্রথম আলোয় প্ল্যাটফর্মের মেঝের ধুলো চিকচিক করে। ভিড়ের আগের এক শান্ত, আশাভরা সুর স্টেশনের বাতাসে ভেসে বেড়ায়। চা-বিক্রেতার কেটলির উষ্ণ ধোঁয়া আর প্রথম যাত্রীদের আনাগোনা শুরু হয়েছে। এই শান্ত প্রস্তুতির মধ্যেই, স্টেশনের মাঝে তৈরি হয় এক নীরব, কিন্তু গভীর মানবিক দৃশ্য।

কেন্দ্রস্থলে স্থির হয়ে আছে একটি ঠেলা গাড়ি (হাতগাড়ি)—বোঝা বহনকারী এক যন্ত্র, যা অসংখ্য মানুষের জীবনের গতি স্থির রাখে। বস্তা, হাঁড়ি-পাতিল, টিনের বাক্স এবং অন্যান্য গেরস্থালির মালপত্রে গাড়িটি ঠাসা। এই মালপত্রগুলো কোনো দীর্ঘ যাত্রার অংশ, যা বহন করছে দূরযাত্রী পরিবারের আশা আর স্মৃতি।

গাড়ির ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এক মধ্যবয়স্ক কুলি, তাঁর পরনে হালকা রঙের একটি সাধারণ শার্ট। তাঁর শারীরিক গঠন মজবুত, বহু বছরের টানা পরিশ্রমে পেশিগুলি কঠিন আকার পেয়েছে। তিনি হাতল শক্ত করে ধরে আছেন, তাঁর চোখ মালপত্রের ভারসাম্যের দিকে নিবদ্ধ। এই ঠেলা গাড়ির প্রধান ভার তাঁর কাঁধেই। তিনি এই স্টেশনের একটি অপরিহার্য অংশ; তাঁর শ্রম না থাকলে এই বিপুল মালপত্র এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরানো অসম্ভব।

তাঁর আশেপাশে দাঁড়িয়ে আছেন যাত্রী ও তাঁদের সঙ্গীরা। তাঁদের মধ্যে আছেন সাদা টুপি ও পাঞ্জাবি পরা প্রবীণ একজন। প্রবীণ ব্যক্তিটি ঝুঁকে মালপত্রের বাঁধন ও ভারসাম্য পরীক্ষা করছেন, আবার কেউ কেউ হয়তো বস্তাটিকে সামান্য ধরে আছেন। এই দৃশ্যটি একটি সুস্পষ্ট বার্তা দেয়: এখানে শ্রমের বিনিময়ে কেবল অর্থ প্রদান করা হয় না; এখানে কুলির প্রতি সম্মান ও আস্থার সম্পর্কও তৈরি হয়। প্রবীণ যাত্রী তাঁর নিজের হাতে কুলিকে সহযোগিতা করছেন—এটি কেবল মানবিক সৌজন্য নয়, এটি একটি উপলব্ধি যে এই ভার বহনকারীর কাজটি কতটা কঠিন।

মোটা দড়িগুলো মালপত্রের উপর শক্ত হয়ে চেপে বসেছে। কুলি জানেন, এই বাঁধনের সামান্য ত্রুটি বা তাঁর গতির সামান্য অস্থিরতা, যেকোনো সময় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাঁর পেশাদারিত্বের প্রমাণ মেলে তাঁর স্থির চাহনি এবং তাঁর হাতে থাকা গাড়ির হাতলের দৃঢ় মুষ্টিতে। তাঁর শার্ট হয়তো মলিন, কিন্তু তাঁর পেশাদারিত্বের দ্যুতি অমলিন।

এই স্টেশন এই কুলির কাছে কেবল কাজের জায়গা নয়। এটি তাঁর দ্বিতীয় কর্মক্ষেত্র, যেখানে তাঁর জীবন বাঁধা পড়েছে। ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত তিনি এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে হেঁটেছেন, মানুষের ভার বহন করেছেন এবং এর বিনিময়ে সামান্য যা পেয়েছেন, তা দিয়েই তাঁর সংসার চলে। প্রতিটি বস্তা, প্রতিটি হাঁড়ি তাঁর কাছে কেবল বস্তু নয়—এগুলি তাঁর পরিবারকে সচল রাখার এক একটি উপকরণ। তিনি জানেন, এই অনিশ্চিত আয়ের জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ নেই, কেবল অধ্যবসায় ছাড়া।

সকালের ভিড় যখন বাড়তে থাকে, ট্রেনের ঘোষণা যখন মাইকে প্রতিধ্বনিত হতে শুরু করে, তখন এই নীরব দৃশ্যপট গতিশীল হয়ে ওঠে। ঢাকা থেকে ট্রেন আসছে, অথবা লালমনিরহাটের ট্রেন ছাড়বে এই ঘোষণা যাত্রীদের মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। কিন্তু কুলি তখনো স্থির। তাঁর মনোযোগ কেবল মালপত্রের সঠিক ভারসাম্যের ওপর।

অবশেষে সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হলো। কুলি ঠেলা গাড়ির হাতলে চাপ দেন। চাকাগুলো ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ তুলে এগোতে শুরু করে। প্রবীণ যাত্রী এবং তাঁর সঙ্গীরা এবার কুলির পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করেন। তাঁরা পথ দেখিয়ে নিয়ে যান এবং মালপত্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করেন। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মালবাহী গাড়িটি প্ল্যাটফর্মের ভিড় ঠেলে এগিয়ে চলে।

এই দৃশ্যটি খুবই সাধারণ, কিন্তু এর মধ্যে রয়েছে এক গভীর মানবিক বার্তা: শহর চলে কাঠামো ও সময়সূচির ওপর, কিন্তু তাকে সচল রাখে মানুষের শ্রম ও পারস্পরিক আস্থা। এই কুলিটির নীরব সংগ্রাম, যা প্রতিদিনের জীবনের একটি অংশ, সেটাই আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, সমাজের মূল ভিত্তি হলো অদৃশ্য শ্রমিকের কাঁধ।

যাত্রীরা তাঁদের পাশ কাটিয়ে চলে যান। কেউ কেউ হয়তো তাকান, কেউ বা না-ও তাকান। কিন্তু এই কুলি জানেন, তাঁর শার্টের উপর চাপানো এই বোঝা শুধু মালপত্রের নয়, তা এই স্টেশনের, এই শহরের, এবং এক বৃহৎ সংখ্যক মানুষের জীবনযাত্রারই অংশ।

দূর প্ল্যাটফর্মের ভিড়ে যখন শার্ট পরা কুলিটির দেহটি ঠেলা গাড়িসহ মিশে যায়, তখন তা কেবল একজন শ্রমিকের গন্তব্যে পৌঁছানো নয়—তা হলো সেইসব অগণিত মানুষের একটি প্রতীক, যারা নাম, যশ বা পরিচিতির তোয়াক্কা না করে প্রতিদিন নিজেদের শ্রম দিয়ে বৃহত্তর সমাজের ভিত গড়ে তোলেন। তাঁর শ্রম ভারী, কিন্তু তাঁর মর্যাদা নীরব, অবিচল এবং গভীরভাবে মানবিক।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ