মাদকসেবনে বাঁধা দেয়ায় রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার কানু দাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) ও বিনয় চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাসকে (১৯) গ্রেফতার করেছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যাকান্ডের কথা স্বীকার করেছেন।
শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় রবিবার (২৩ আগস্ট) দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে, পুলিশ মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। তিনি জানান, শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির পাশর্^বর্তী ভবন দেবু দাসের। সেই ভবন দিয়ে বৃহস্পতিবার ভোর রাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ শিক্ষক গণপতির বাড়ির ছাদে উঠে আসে। সেখানে বসে ইয়াবা সেবনের এক পর্যায়ে শব্দ পেয়ে ছাদে আসেন শিক্ষক গণপতি। তিনি ঘাড়ে গামছা নিয়ে ছাদে আসেন। তাদের দেখে ইয়াবা সেবনের ব্যাপারে প্রশ্ন করায় মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ তাৎক্ষনিক গণপতির ঘাড়ের গামছা গলায় পেঁচিয়ে তাকে নিমর্মভাবে হত্যা করে। হত্যার সময় শিক্ষক গণপতি আওয়াজ করলে স্ত্রী প্রীতিলতা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকে। ওৎ পেতে থাকা মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ সিঁড়িতেই ওই গামছা প্রীতিলতার গলায় পেঁচিয়ে হত্যা করে। প্রীতিলতার চিৎকারে সিঁড়ির দিকে মাস্টার্স পড়ুয়া মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এগিয়ে আসলে তাকেও গলায় গামছা পেঁছিয়ে হত্যার চেষ্টা করে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। এতেও সে মারা না গেলে রশি এনে তার গলায় ও মুখে পেঁচিয়ে জোরে টান দেয় তারা। এতে আগামীর মুখের চোয়াল ভেঙ্গে যায়। এরপর শিশু প্রিয়মের ঘরে এসে তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতে পায় মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। চিনে ফেলতে পারে এমন শংঙ্কায় প্রিয়মকে ঘুমন্ত অস্থায় গলায় গামছা পেঁচিয়ে ও বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, খুনের পর উত্তেজিত ছিল মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। এরপর কিছুক্ষণ পর তারা শান্ত হলে প্রিয়মের বাথরুমে প্রথমে সিদ্ধার্থ গোসল করে। এরপর মুগ্ধ গোসল করে তাদের ডাইনিং টেবিলে বসে। সেখানে একটি বয়ামে থাকা খেজুর খায় তারা। এরপর ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খাওয়ার পর দু’জন সেখানে ইয়াবা সেবন করে। সকাল হয়ে গেলে তারা পালানোর পরিকল্পনা করতে থাকে। জুমার দিন হওয়ায় নামাজের সময় শিক্ষক গণপতির বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে তারা। ঘটনাকে ডাকাতি বলে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ বাড়ির বিভিন্ন আসবাবপত্র তছনছ করে মেঝেতে ফেলে রাখে। আলমারীর ড্রয়ার ভেঙ্গে সেখান থেকে স্বর্ণালংঙ্কার নিয়ে নেয়।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, গণপতি স্যারের ছাদে বসে নেশা করতে দেখে ফেলার কারণে গণপতি স্যারসহ একে একে তার পরিবারের ৪ সদস্যকে হত্যা করে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। প্রিয়ম যেহেতু খুনীদের চেনে, তাই তাকেও হত্যা করেছে তারা। এ ঘটনায় মেট্রোপলিটন কোতয়ালী থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। দ্রুত আসামীদের গ্রেফতারসহ রহস্য উদ্ঘাটন করতে পেরেছি। এজন্য সকল সংস্থার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আসামীদের বিচারের আওতায় আনতে দ্রুত চার্জশীট প্রদান করার কথা জানান পুলিশ কমিশনার।
এদিকে একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় আসামীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবীতে মানববন্ধন-সমাবেশ করেছে রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক সংগঠন। রবিবার (২৩ আগস্ট) দুপুরে জিলা স্কুল প্রাঙ্গনে এতে বক্তব্য রাখেন, শিক্ষার্থী আবির হোসেন, অর্নব রায়, মাজেদুল ইসলামসহ অন্যরা। এ সময় আসামীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবীসহ নগরবাসীর নিরাপত্তা দিতে পুলিশকে আরও তৎপর হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এরপর শিক্ষার্থীরা পুলিশ কমিশনার কার্যালয় ঘেরাও করে। হত্যাকান্ডের ঘটনায় কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থী, বাসদসহ বিভিন্ন সংগঠন নগরীতে মানববন্ধন সমাবেশ করে দোষীদের বিচারের দাবী জানায়।
উল্লেখ্য, রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার বাসিন্দা রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে তার স্বজনরা সাড়াশব্দ না পাওয়ায় শনিবার সন্ধ্যায় পুলিশে খবর দেয়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে বাড়ির তালা ভেঙ্গে চিলেকোঠায় গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), সিঁড়িতে স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫২) ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং দোতলায় শোবার ঘরে রংপুর জিলা স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া প্রিয়ম চক্রবর্তীর (১২) লাশ দেখতে পায় পুলিশ। এমন মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের ঘটনায় রংপুরসহ দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়