রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার আলমবিদিতর ইউনিয়নে তিস্তা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। এই ঘটনায় অভিযোগের তীর উঠেছে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সভাপতি মোকলেছুর রহমান এবং ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পাইকান ডাক্তারপাড়া এলাকার চিহ্নিত অবৈধ বালু ব্যবসায়ী হামিদুর রহমানের বিরুদ্ধে।
শনিবার (২৫ অক্টোবর) সকালে প্রাপ্ত অভিযোগের ভিত্তিতে গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান মৃধা তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করেন। সকাল ৭টায় বালুর পয়েন্টে গিয়ে তিনি বালু উত্তোলনের যন্ত্রপাতি জব্দ করেন এবং এ সময় সুজন মহন্ত (২৭) নামে এক যুবককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ড দেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বালু ব্যবসায়ী হামিদুল এর আগেও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঘাগট ও তিস্তা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে ব্যবসা চালিয়েছেন। সে সময় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হলেও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে তিনি বেরিয়ে এসেছেন। আওয়ামী সরকারের পতনের পর তার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। তবে এবার তিনি কৌশল পরিবর্তন করে জামায়াত নেতা মোকলেছুর রহমানকে ব্যবহার করছেন। মোকলেছুর রহমানের জমিতেই ড্রেজার মেশিন বসিয়ে তিস্তার বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
শুক্রবার বিকেলে আলমবিদিতর ইউনিয়নের বড়াইবাড়ী পাইকান হাজীপাড়া এলাকায় সরজমিনে দেখা যায়, তিস্তা নদীর ডান তীরে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে দেদারসে বালু উত্তোলন চলছে। সেখানে কর্মরত শ্রমিক বাদল চন্দ্র রায়ের সাথে কথা বললে তিনি জানান, মোকলেছুর নামের এক ব্যক্তি হামিদুলের মেশিন দিয়ে বালু তুলছেন। তিনি নিজেকে শুধুমাত্র একজন “লেবার মানুষ” বলে পরিচয় দেন।
তিস্তার পাড়ে বসবাসকারী ৬৫ বছর বয়সী খুকি নামের এক নারী আক্ষেপ করে বলেন, “এভাবে বালুগুলা তুলি নিয়া যাচ্ছোল, নদীত পানি আসলে তো আবার ভাঙি যাইবে। হামরা কথা কইলে হামার কথার দামও দেয় না। আবার তো বাঁধের পিচিংয়ের গোড়া আলদা হইবে।”
অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য রিপন মিয়া জানান, মূলত রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রায় দেড় লাখ সেফটি বালু উত্তোলনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দিনে দুপুরে প্রকাশ্যে বালু তুলে বিক্রি করা হচ্ছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, এভাবে বালু উত্তোলন চলতে থাকলে বর্ষাকালে বড় বড় গর্ত তৈরি হবে এবং আশপাশের ফসলি জমি, তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ৩০ থেকে ৪০টি পরিবারের বসতভিটা বিলীন হয়ে যাবে। তিনি অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের মাধ্যমে তাদের রক্ষা করার জন্য প্রশাসনের কাছে আবেদন জানান।
এ বিষয়ে জামায়াত নেতা মোকলেছুর রহমান মুঠোফোনে জানান, তিনি একটি চাতাল করার জন্য বালু তুলছেন। বালু উত্তোলন বৈধ কিনা জানতে চাইলে তিনি স্বীকার করেন, “আসলে এটি অবৈধ, তবে আর দুই-তিন দিন তুললে হয়ে যাবে।”
অবৈধ বালু ব্যবসায়ী হামিদুল ইসলাম বলেন, “মামলা খেতে খেতে সব শেষ হয়ে গেছে ভাই। অনেক দিন ধরে ব্যবসাও বন্ধ, পকেটও ফাঁকা। এই জন্যই আবার শুরু করছি।” তিনি প্রতিবেদককে তার বিকাশ নম্বর চেয়ে কিছু “খরচ” পাঠানোর প্রস্তাব দেন।
আলমবিদিতর ইউনিয়নের জামায়াতের আমির মাওলানা সামিউল ইসলাম অবশ্য মোকলেছুরকে জামায়াতের নেতা বলতে অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “উনি জামায়াতের কোনো পদ-পদবিতে নেই। এখন তো ভোটের একটা সিজন তৈরি হয়েছে, উনি ভোটার এবং সমর্থক।” তবে তার কথাতেই মোকলেছুর রহমানের জামায়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান মৃধা জানান, অভিযোগ পাওয়ার পরপরই তারা খোঁজখবর নিয়ে সকালে ঘটনাস্থলে অভিযান চালান। এ সময় হামিদুলের বালুর পয়েন্ট দেখাশোনা করা সুজন মহন্ত নামে একজনকে খুঁজে পান। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে তিন মাসের জেল দেওয়া হয়। একই সাথে বালু উত্তোলনের যন্ত্রপাতিগুলো জব্দ করা হয়।