একই অফিসে দুই দশকের বেশি সময় চাকরি, বদলি নীতিমালা উপেক্ষার অভিযোগ — ঘুষ, টেন্ডারবাজি ও শক্তিশালী সিন্ডিকেট গঠনের দাবি
রংপুর সামাজিক বন বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে একই কর্মস্থলে চাকরি করা একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষ, টেন্ডারবাজি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারী ঠিকাদার ও সচেতন মহলের দাবি, একটি সংঘবদ্ধ শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারণে বিভাগটি কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন গাইবান্ধা জেলার সাদুল্লাপুর উপজেলার কাজি পাড়া এলাকার বাসিন্দা, মৃত হেমন্ত চন্দ্র মহন্তের ছেলে গোপাল চন্দ্র মহন্ত। তিনি ১৯৯৫ সালে রংপুর সামাজিক বন বিভাগ কার্যালয়ে কাম কম্পিউটার পদে যোগদান করেন। দীর্ঘ ২০ বছর একই অফিসে চাকরির পর অফিস সহকারী পদে কর্মরত থাকা অবস্থায় ট্রেজারার (কোষাধ্যক্ষ) পদে নিয়োগ পেয়ে খুলনার বাগেরহাট জেলায় যোগদানের কথা থাকলেও, অভিযোগ অনুযায়ী তিনি মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে রংপুর অফিসেই বহাল থাকেন।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, গোপাল চন্দ্র মহন্ত গত প্রায় ৩১ বছর ধরে একই অফিসে কর্মরত থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। তাদের দাবি, নির্ধারিত সিডিউল অনুযায়ী কাজের বিল ছাড় করতে প্রতি সিডিউলে অতিরিক্ত দুই হাজার টাকা আদায় করা হয়। পাশাপাশি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কারসাজি করে নিজস্ব পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
এই অনিয়মের পেছনে একই অফিসের প্রধান সহকারী মর্জিয়ানা বেগমের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তিনি প্রায় ১০ বছর ধরে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে একই অফিসে কর্মরত। এছাড়াও শাহ আলম মন্ডল ও উচ্চমান সহকারী ইসারুল হককে সঙ্গে নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।
সচেতন মহলের প্রশ্ন, কোন আইন বা বিধিমালার আওতায় গোপাল চন্দ্র মহন্ত, মর্জিয়ানা বেগম, ইসারুল হক ও শাহ আলম মন্ডল এক যুগেরও বেশি সময় ধরে একই অফিসে কর্মরত রয়েছেন। তাদের মতে, এই সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ ঠিকাদাররা নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন এবং রংপুর সামাজিক বন বিভাগ কার্যত একটি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
অভিযুক্তদের কর্মজীবনের তথ্য অনুযায়ী, গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার পাঠানোসা গ্রামের বাসিন্দা মৃত আব্দুল কুদ্দুস মন্ডলের ছেলে শাহ আলম মন্ডল ১৯৯৫ সালে রাঙ্গামাটিতে কাম কম্পিউটার পদে যোগদান করেন। পরে ২০০০ সালে বগুড়া সার্কেল হয়ে সরাসরি রংপুরে যোগ দেন এবং তখন থেকে প্রায় ২৬ বছর ধরে রংপুরেই কর্মরত রয়েছেন।
অন্যদিকে রাজশাহী জেলার চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা মৃত আব্দুল গফুরের ছেলে ইসারুল হক ১৯৯৫ সালে ফরিদপুর জেলায় ইউডিএ পদে চাকরি শুরু করেন। ২০০৮ সালে তিনি রংপুরে যোগদান করেন এবং চলতি ২০২৬ সাল পর্যন্ত সেখানেই কর্মরত আছেন।
সরকারি চাকরিতে সাধারণত ৩ থেকে ৫ বছর পরপর বদলির বিধিমালা থাকলেও, নিরবচ্ছিন্নভাবে ২০ বছর বা তার বেশি সময় একই কর্মস্থলে চাকরি করার কোনো সুনির্দিষ্ট সাধারণ নিয়ম নেই। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একই স্থানে দীর্ঘদিন চাকরি করাকে নিরুৎসাহিত করা হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
তবে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, কর্তৃপক্ষ বদলি না করায় তারা একই কর্মস্থলে রয়েছেন এবং এতে তাদের কোনো ব্যক্তিগত দায় নেই।
এ বিষয়ে রংপুর সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোঃ নুরুল ইসলাম বলেন, “আমার বদলি করার ক্ষমতা নেই। তবে তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে প্রতিবেদন পাঠানো হবে।” তবে গাছ লাগানো ও গাছের টেন্ডার সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।
সচেতন মহলের দাবি, রংপুর সামাজিক বন বিভাগে অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বদলি নীতিমালার যথাযথ প্রয়োগ না হলে দুর্নীতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেবে।